বিপিসির জ্বালানি তেলের মজুদ সক্ষমতা বাড়ছে আরো আড়াই লাখ টন

দেশে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত মিলিয়ে মোট ১৩ লাখ ৮ হাজার ৮০০ টনের মতো জ্বালানি তেলের মজুদ সক্ষমতা রয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি)।

দেশে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত মিলিয়ে মোট ১৩ লাখ ৮ হাজার ৮০০ টনের মতো জ্বালানি তেলের মজুদ সক্ষমতা রয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি)। চাহিদা বিবেচনায় মজুদ সক্ষমতা গড়ে তুলতে নতুন করে আরো চারটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি। এসব প্রকল্পের মাঠ পর্যায়ের কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে। পুরো প্রকল্পগুলো শেষ হলে নতুন করে আরো ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮০০ টনের মতো জ্বালানি তেলের মজুদ সক্ষমতা যুক্ত হবে। সব মিলিয়ে বিপিসির মজুদ সক্ষমতা বেড়ে দাঁড়াবে দেশের জ্বালানি চাহিদার প্রায় এক-চতুর্থাংশ।

বিপিসি বলছে, দেশে প্রতিনিয়ত জ্বালানি তেলের চাহিদা বাড়ছে। বিশ্ববাজারেও জ্বালানি তেলের দাম বছরের বিভিন্ন সময় অস্থিতিশীল থাকে। বৃহৎ মজুদ সক্ষমতা ও অত্যাধুনিক অবকাঠামো সুবিধা গড়ে তোলা গেলে বিপিসির অপ্রয়োজনীয় খরচ কমে আসবে, অন্যদিকে জ্বালানি তেল পরিবহনে সময়ও বাঁচবে, যা সামগ্রিকভাবে ভোক্তার ব্যয় কমাতে সহায়তা করবে।

বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, সমুদ্র থেকে পাইপলাইনে স্থলভাগে জ্বালানি তেল পরিবহনের জন্য ইনস্টলেশন অব সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) উইথ ডাবল পাইপলাইন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বিপিসি। ২০১৫ সালে এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু হয়, যা চলতি ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। এ প্রকল্পে বিপিসির মোট জ্বালানি তেলের মজুদ সক্ষমতা বাড়ছে দুই লাখ টন। এর মধ্যে ক্রুড অয়েল মজুদ সক্ষমতা বাড়বে ১ লাখ ২৫ হাজার টন। আর ডিজেলের বাড়বে ৭৫ লাখ টন।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এসপিএম প্রকল্পের অফিশিয়ালি কাজ শেষ হচ্ছে চলতি মাসে। যদিও এ প্রকল্পে কমিশনিং কার্যক্রম এরই মধ্যে সম্পন্ন করেছে বিপিসি। তবে প্রকল্পটি চালু করতে আরো অন্তত নয় মাস সময় প্রয়োজন। কারণ অপারেশন কার্যক্রম পরিচালনা করতে বিদেশী কোম্পানি নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বিপিসি উন্মুক্ত টেন্ডারের মাধ্যমে এসপিএমের অপারেশনে যেতে কোম্পানি নিয়োগ দেয়ার প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করেছে।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণকারী উড়োজাহাজের জ্বালানি তেল সরবরাহের জন্য নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর কাঞ্চন ব্রিজ থেকে ঢাকার কুর্মিটোলা পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার পাইপলাইন প্রকল্পের মেয়াদ দুই দফায় বাড়িয়েও শেষ করতে পারেনি বিপিসি। কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপো পর্যন্ত এ লাইন নির্মাণের ফলে জ্বালানি তেলের নয় হাজার টন মজুদ সক্ষমতা গড়ে তুলেছে বিপিসি। এর মাধ্যমে উড়োজাহাজের জ্বালানি তেল জেট এ-১ বছরে অন্তত নয় লাখ টন পরিবহন করা যাবে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পিতলগঞ্জ-কুর্মিটোলা পাইপলাইন প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে ৩৩৯ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। প্রকল্পের সর্বশেষ অগ্রগতির বিষয়ে চলতি বছরের ২৭ অক্টোবর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে এক সভায় জানানো হয়, অসমাপ্ত প্রকল্পের কাজ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড (২৪ ইসিবি) শেষ করবে।

চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত পাইপলাইনে জ্বালানি তেল পরিবহনে ৩ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন নির্মাণ করছে বিপিসি। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বিপিসির ২১ হাজার টন মজুদ সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য খালাসের সময় জ্বালানি তেলের চুরি ও আশপাশের সিন্ডিকেটের কারসাজি প্রতিরোধ করা। বিশেষ করে গোদনাইল ডিপোতে খালাসের সময় এ ধরনের ঘটনা ঘটে। জাহাজ মালিক ও সিন্ডিকেটের বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও পাইপলাইনটির কাজ শেষ হতে চলেছে। ২৫ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পে বছরে ৫৪ লাখ টন ডিজেল পরিবহনের সক্ষমতা থাকবে।

ভারত থেকে পাইপলাইনে জ্বালানি তেল আমদানির জন্য ৩১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের কাজ শেষ হলে বিপিসির অতিরিক্ত ২৮ হাজার ৮০০ টন ডিজেল মজুদের সক্ষমতা তৈরি হবে। আগামী বছরের জুনে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। ভারতের নুমালীগড় রিফাইনারি থেকে বাংলাদেশের দিনাজপুরের পার্বতীপুর ডিপো পর্যন্ত এ পাইপলাইন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। গত বছরের ১৮ মার্চ এ প্রকল্পের উদ্বোধন করেন বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বর্তমানে এ প্রকল্পের অটোগেজিং সিস্টেম, স্ক্যাডা সিস্টেম, পিএলসি সিস্টেম ও ফিনিশিং কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এরই মধ্যে প্রকল্পের প্রায় ৬৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছে বিপিসি।

বিপিসির চেয়ারম্যান মো. আমিন উল আহসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘জ্বালানি তেলের অত্যাধুনিক অবকাঠামো সুবিধা এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে আমদানি ব্যয় কমাতে ও সময় বাঁচাতে অত্যাধুনিক পাইপলাইন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সমুদ্র থেকে স্থলভাগে পাইপলাইনে জ্বালানি তেল আমদানি কার্যক্রম দ্রুতই শুরু হতে যাচ্ছে। এতে জ্বালানি তেল পরিবহনে লাইটার জাহাজের কার্যক্রম ও অপচয় কমবে। স্থলভাগে জ্বালানি তেল পরিবহনে অপারেশনাল লোকসান, দুর্ঘটনা এমনকি দ্রুত সময়ের মধ্যে ডিপোয় তেল পৌঁছাতে এসব প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সঙ্গে বিপিসির জ্বালানি তেল পরিবহনসংক্রান্ত কার্যক্রমে বছরে যে অর্থ ব্যয় হতো সেটিও কমে আসবে।’

দেশে ডিজেল, পেট্রল, অকটেন, ফার্নেস অয়েল, মেরিন ফুয়েল ও বিমানের জ্বালানি তেলসহ মোট চাহিদা রয়েছে গড়ে ৭২ লাখ টনের মতো। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা ডিজেলের। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিপিসির সরবরাহকৃত জ্বালানি তেলের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬৮ লাখ টন। এর মধ্যে বিপিসি অপরিশোধিত ক্রুড অয়েল আমদানি করে বছরে ১৫ লাখ টন। বাকি পরিশোধিত জ্বালানি তেল জিটুজি ও উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বেশ কয়েকটি দেশ থেকে আমদানি করা হয়। এরপর বিপিসি তার বিপণন কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে তা সারা দেশে সরবরাহ করে।

আরও